মুহাম্মদ সালমান কাজি
এক ব্যাতিক্রমী মানুষের গল্প : আর্দশিক তারুণ্যের আইডল সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
আপলোড সময় :
২৬-০৯-২০২৫ ০৬:২৬:৪৬ পূর্বাহ্ন
আজ আপনাদের একজন ব্যতিক্রমী কর্মবীর মানুসের গল্প শুনাবো। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা সংস্কৃতি , সাহিত্য ও সমাজসেবায় যে কয়জন বিদগ্ধ তরুন ইসলামী স্কলার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিরব নিভৃর্তে তিনি তাদের অন্যতম।
কিছু কিছু মানুষ আছেন,যারা কথা কম বলেন, কাজ বেশি করেন। আল্লাহ ধরনীতে কাজের জন্যই তাদের জন্ম দিয়েছেন। জিন্দাবাদ নিন্দাবাদ তোয়াক্কা না করে তারা কাজ করে যান আপন মনে। সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ সেই সব কর্মবীর মানুষদের একজন। মাদরাসা, স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ফলে বুহুমূখি জ্ঞান ও কর্মতৎপর একজন চিন্তাশীল গুনী ব্যাক্তিত্ব তিনি।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ একাধের একজন লেখক, গবেষক, বহুগ্রন্থপ্রণেতা, শিক্ষক, চিকিৎসক, সংগঠক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। একজন বিদগ্ধ আলেমেদ্বীন। তিনি জনপ্রিয় জাতীয় ইসলামি পত্রিকা 'মাসিক দ্বীনী দাওয়াত' ও পাঠকপ্রিয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ন্যাশনাল টইমস টোয়েন্টিফোর এর সম্পাদক।
অনুবাদ মৌলিক মিলে তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। আযাদাী আন্দোলন নিয়ে তিনিই প্রথম জনপ্রিয় উপন্যাস লিখেছেন "রাজমহলের নন্দিনী, আযাদীর লড়াই সিরিজ উপন্যাস তার সৃষ্টিশীলতার অমরকৃর্তি। গল্প উপন্যাস, ছড়া কবিতা, গবেষনা, সাহিত্যের সকল শাখায় তার সফল বিচরণ। হায়াতুস সাহাবার মতো বৃহৎ ৫খন্ডের জগতখ্যাত কিতাবের তাহকীক তারখিজ অর্থাৎ ব্যাখ্যা টিকা সূত্র সহ পুনাঙ্গ বঙ্গানুবাদ করেছেন। গড়ে তোলেছেন দেশের অন্যতম বৃহত্তর ইসলামী প্রকাশনা সংস্থা 'মাকতাবায়ে ইলিয়াস'।
শিশুদের জন্য লিখেছেন ৫৫টি শিশুতোষ পাঠ্য বই। কওমী মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিাহাসকে ধারাবাহিক সকল শ্রেণিতে পাঠ্য করার তিনি মহান কারিগর। তার লিখিত শিশুদের পাঠ্য বাংলাদেশের হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্য বই হিসাবে বিবেচিত ও ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি জাতীয় কওমী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মহাপরিচালক। গড়ে তোলেছেন, ' ইসলামি শিশু শিক্ষা গবেষনা কেন্দ্র"। এছাড়া শিশুপাঠ্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'ইউসুফ পাবলিশার্স" এর কর্ণধার তিনি।
একজন দক্ষ সমাজকর্মি ও সংগঠক তিনি। সমাজসেবায় রয়েছে তার অসামান্য অবদা। তিনি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তরফরত্ন ফাউন্ডেশন। ২০১৯ সালে গড়ে তুলেন আস-সীরাত ফাউন্ডেশন। তিনি এর চেয়ারম্যান। আস-সীরাত ফাউন্ডেশন নানান সামাজিক কল্যানমূলক কাজও দুস্ত অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছে বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজগুলো সর্বমহলে প্রসংশিত। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন " পথশিশুদের মক্তব" নামে একটি ভিন্নধারার শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ইসলামর শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের তিনি একজন পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। বিশেষ করে কওমী মাদরাসা সনদের রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি আন্দোলনে তিনি প্রথম সাড়িতে কাজ করেছেন। কওমী শিক্ষা সংস্কারের উপর লিখেছেন শতাধিক প্রবন্ধ নিবন্ধ ও গবেষনাপত্র। ২০০২ সাল থেকে কওমী শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কাজ করছেন, কওমী শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন কমাশিশার মাধ্যমে তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। কওমী মাদরাসার শিক্ষার সাথে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়ের তিনি পথপ্রদর্শক। মাদরাসা ও জেনারেল শিক্ষার সমন্বিত প্রয়াসের তিনি রূপকার।।
২০২১ সালে তিনি গড়ে তুলেছেন "জামিয়া কাশিফুল উলুম ঢাকা" নামে এক ব্যাতিক্রমধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল একটি মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ'র ভাষায় এটি একবিংশ শতাব্দীর নতুন ধারার একটি শিক্ষা আন্দোলন। একটি অনিবার্য ইসলামি শিক্ষা বিপ্লবের রোল মডেল। তিনি একজন সফল মানুষ গড়ার কারিগর। একজন আর্দশ শিক্ষক বা উস্তাদ হিসাবে ছাত্রদের কাছে জনপ্রিয়। সারাদেশে ছড়িয়ে আছে তার অসংখ্য ছাত্র ও শিষ্য। তার উস্তাদ আরবী শিক্ষার প্রবাদ পুরুষ, মুফাক্কিরে ইসলাম মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রহমতুল্লা আলাইহি এর খলিফা আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহমতুল্লাহ আলাইহির হাত ধরে কওমী মাদরাসায় আরবী শিক্ষার পাঠদানকে তিনি সহজ করে তুলে এক মহান খেদমতের আঞ্জাম দিচ্ছেন ।
তিনি "সমন্বিত দাওয়াহ নেসাব " নামে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা সিলেবাস ও কারিকুলাম চালু করেছেন। সমন্বিত দাওয়াহ নেসাব তার দুই যুগ শিক্ষা গবেষনার উদ্ভাবনী ফসল। তিনি ফুনুনে দাওয়াত বা দাওয়াহ বিভাগ হিসাবে মাদরাসা শিক্ষার সাথে দাওয়াত ভিত্তিক সিলেবাসের এক নতুন পথচলা শুরু করেছেন। কওমী মাদরাসার সকল জামাতে আরবী দাওয়াহ ভিত্তিক কিতাবকে পাঠ্য করে, পৃথিবীর ইতিহাসে দাওয়াত ভিত্তিক এক নতুন ধারার শিক্ষা আন্দোলন তিনি গড়ে তোলেছেন।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ কেবল একজন জনপ্রিয় লেখক, সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল ব্যাক্তিত্বই নন। শিক্ষা ও সমাজ সেবার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ সংগঠক। জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ এর, সিলেবাস ও গবেষণা পরিচালক। বাংলা একাডেমি, জাতীয় প্রেসক্লাব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর বিশ্বকোষের সাথে জড়িত ও কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ইসলামি জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন বিজা এর অর্থ সম্পাদক। তরফ সাহিত্য পরিষদ, জাতীয় লেখক পরিষদ, বাংলাদেশ ইউনানী আয়ূবেদিক চিকিৎসা পরিষদ সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইউনানী আয়ূবেদিক চিকিৎসার সাথে জড়িত। একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসাবে হাকীম সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ নামে সর্বমহলে পরিচিত। দেশব্যাপী একজন জনপ্রিয় চিকিৎসক হিসাবে তার প্রচুর সুনাম রয়েছে। তার আবিস্কৃত "মাজুনে মুমসিক' ইন্দ্রিয় শক্তিবর্ধক এক মহৌষধ। যা তাকে খ্যাতি ও অর্থ দুটিই এনে দিয়েছে। তিনি পাইলস ও প্যাস্টুলার একজন অভিজ্ঞ এবং সফল চিকিৎসক। তিনি গড়ে তুলেছেন মক্কা ভেষজ কুঠির ও মক্কা আয়ূবেদিক কূটির নামে দুটি ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। ইউনানী বিডি তার অনলাইন ভিত্তিক চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে জড়িত। তাবলীগ বিষয়ক অসংখ্য কিতাব লিখেছেন। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় তাবলীগের পাঠ্য কিতাব 'ফাজায়েলে আমল, ফাজায়েলে সাদাকাত, হায়াতুস সাহাবাহ, ফাজায়েলে হজ্ব এর মতো মকবুল কিতাবের তিনি অনুবাদক। হকের প্রশ্নে সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ আপোষহীন। তিনি সত্যে ন্যায় এর পক্ষে এক লড়াকু বীর। স্রোতের বিপরীতে সত্যকে আঁকড়ে থাকা এক আর্দশ তিনি। তার বিরোধাতাকারীদের শত জুলুম নির্যাতন অপবাদ সহ্য করে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন উম্মাহ জন্য। ২০০৬ সালে তিনি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র মজলিসে একজন তরুণ ছাত্রনেতা হিসাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের গন আন্দোলনে তিনি চিকিৎসা টিমের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহর জন্ম হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উত্তরসুর গ্রামের সৈয়দ পরিবারে। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ তরফরত্ন সৈয়দ আবদুল্লাহ ও মহীয়সী নারী শেখ জাহানারা আক্তারের একমাত্র সন্তান। বাংলা সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতায় এপরিবারের মনীষীদের অবদান উপমহাদেশখ্যাত। বাংলা রম্য গদ্যের নির্মাতা বহুভাষাবিদ পন্ডিত ড. সৈয়দ মুজতবা আলী ও আযাদী সংগড়ামী ওলীয়ে কামেল শাহ সুফি মাওলানা আব্দুল হামিদ রহ সহ অসংখ্য গুনী মনীষীদের জন্ম হয়েছে এই পরিবারে। বৃটিশ বিরোধী আযাদী আন্দোলন, ৫২'র ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সহ সকল স্বাধীকার আন্দোলনে এপরিবারের মনীষীদের অসামান্য অবদান রয়েছে।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ শিক্ষা সাহিত্য সমাজসেবা ও চিকিৎসার উপর অসমান্য অবদানের জন্য অনেক জাতীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কার, সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ কেবল একটি নামই নয়। একটি আর্দশ, একটি চেতনা। একজন নিরলস কর্মবীর লেখক ও সংগঠক। আর্দশিক তারুণ্যের একজন আইডল।
কমেন্ট বক্স